ভারত বনাম আফগানিস্তান— এই দুই দলের লড়াইটা দেখতে বেশ মজার। একদিকে ভারত, ক্রিকেট বিশ্বের বড় শক্তি, যাদের ব্যাটিং লাইনআপ লম্বা আর বোলিংয়েও অনেক বিকল্প। অন্যদিকে আফগানিস্তান, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই যারা বড় বড় দলকে ভয় ধরিয়ে দিতে শিখে গেছে। রশিদ খান, মোহাম্মদ নবী বা ফজলহক ফারুকির মতো খেলোয়াড়রা একা হাতেই যেকোনো ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
মজার ব্যাপার হলো, আফগানিস্তান অনেকবার ভারতের মাটিতেই নিজেদের “ঘরের মাঠ” সিরিজ খেলেছে— দেরাদুন, গ্রেটার নয়ডা, লখনৌ এসব জায়গায়। তাই দুই দলের সম্পর্কটা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, একটা সহযোগিতার গল্পও আছে এর পেছনে। কিন্তু মাঠে নামলে অবশ্য কেউ কাউকে ছাড় দেয় না।
তাহলে আসল প্রশ্ন— মুখোমুখি লড়াইয়ে আসলে কে এগিয়ে? পরিসংখ্যান দেখলে উত্তরটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়, তবে তার মধ্যেও আছে টাই ম্যাচ, সুপার ওভার আর ইনিংস ব্যবধানে হারের মতো কিছু মজার ঘটনা। চলুন একে একে দেখি।
ভারত বনাম আফগানিস্তান মুখোমুখি রেকর্ড
২০১০ সালে টি-টোয়েন্টি দিয়ে শুরু হওয়া এই লড়াই এখন টেস্ট আর ওয়ানডে পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভারত বনাম আফগানিস্তান হেড টু হেড রেকর্ড বলছে, এখনো পর্যন্ত ভারতের কাছে একটা ম্যাচও জিততে পারেনি আফগানিস্তান।
টি-টোয়েন্টিতে ভারত বনাম আফগানিস্তান
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| মোট ম্যাচ | ৯টি |
| ভারতের জয় | ৮টি |
| আফগানিস্তানের জয় | ০টি |
| টাই | ১টি (পরে সুপার ওভারে ভারত জেতে) |
| ফলাফল হয়নি | ১টি |
| শেষ ম্যাচের ফল | ভারত জয়ী (সুপার ওভারে, বেঙ্গালুরু, জানুয়ারি ২০২৪) |
ওয়ানডেতে ভারত বনাম আফগানিস্তান
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| মোট ম্যাচ | ৭টি |
| ভারতের জয় | ৬টি |
| আফগানিস্তানের জয় | ০টি |
| টাই | ১টি (২০১৮ এশিয়া কাপ) |
| ফলাফল হয়নি | ০টি |
| শেষ ম্যাচের ফল | ভারত জয়ী (৯ উইকেটে, চেন্নাই, জুন ২০২৬) |
টেস্টেও একই গল্প। দুই দল এখন পর্যন্ত দুটো টেস্ট খেলেছে, আর দুটোতেই জিতেছে ভারত। ২০২৬ সালেরটা তো জিতেছিল এক ইনিংস আর ৩০০ রানের বিশাল ব্যবধানে। মোট কথা, টেস্ট-ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে আফগানিস্তান এখনো ভারতকে হারাতে পারেনি একবারও।
ভারত বনাম আফগানিস্তান শেষ পাঁচ ম্যাচ
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দল কেমন খেলেছে, সেটা বুঝতে হলে শেষ পাঁচটা ম্যাচের দিকে চোখ রাখা দরকার।
| তারিখ | ম্যাচ | ভেন্যু | ফলাফল | জয়ী |
|---|---|---|---|---|
| ২০ জুন ২০২৬ | ৩য় ওয়ানডে | চেন্নাই | ৯ উইকেটে জয় | ভারত |
| ১৭ জুন ২০২৬ | ২য় ওয়ানডে | লখনৌ | ১৭০ রানে জয় | ভারত |
| ১৪ জুন ২০২৬ | ১ম ওয়ানডে | ধর্মশালা | ৭ উইকেটে জয় | ভারত |
| ৬-১০ জুন ২০২৬ | একমাত্র টেস্ট | মুলানপুর | ইনিংস ও ৩০০ রানে জয় | ভারত |
| ১৭ জানুয়ারি ২০২৪ | ৩য় টি-টোয়েন্টি | বেঙ্গালুরু | টাই, পরে সুপার ওভারে জয় | ভারত |
এই পাঁচ ম্যাচ দেখলেই বোঝা যায়, শেষ কয়েক বছরে আফগানিস্তান ভারতের সামনে একদমই দাঁড়াতে পারেনি। ২০২৬-এর জুনে টেস্ট আর ওয়ানডে সিরিজে ভারত রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছে ওদের, বিশেষ করে ইনিংস ব্যবধানে টেস্ট জয়টা আফগানিস্তানের জন্য বড় একটা ধাক্কা। তবে ২০২৪ সালের বেঙ্গালুরু ম্যাচটা দেখিয়ে দিয়েছিল, চাইলে আফগানিস্তান শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পারে— ম্যাচ টাই করে সুপার ওভার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা না। মানে ফলাফলের হিসেবে ভারত এগিয়ে থাকলেও, সব ম্যাচেই যে একতরফা হার হয়েছে তা কিন্তু না।
সেরা ব্যাটিং ও বোলিং পারফরম্যান্স
কিছু নাম মনে রাখার মতো। ২০২৬ সালের ওয়ানডে সিরিজে শুবমান গিল সবার ওপরে ছিলেন, তিন ম্যাচেই ২৩৮ রান করে সিরিজ-সেরাও হয়েছিলেন। আফগানিস্তানের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেন রহমানুল্লাহ গুরবাজ, ১৪৮ রান। একই সফরের টেস্টে গিল করেন ১২৬ রান, আফগানিস্তানের রহমত শাহ করেন ৭৩ রান।
বল হাতে টেস্টে ভারতের মানব সুথার নেন ৭ উইকেট, আফগানিস্তানের মোহাম্মদ সেলিম নেন ৬ উইকেট। ওয়ানডে সিরিজে গুরনূর ব্রার নেন ৭ উইকেট, আর চেন্নাইয়ের ম্যাচে প্রসিধ কৃষ্ণা একাই পাঁচ উইকেট নিয়ে আফগান ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে দেন। আফগানিস্তানের রশিদ খান আর নাঙ্গিয়াল খারোতি নেন ৪টি করে উইকেট।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারির টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারতের শিবম দুবে সবচেয়ে বেশি ১২৪ রান করে সিরিজ-সেরা হন, আফগানিস্তানের গুলবদিন নাইব করেন ১১২ রান। বল হাতে সেবার অক্ষর প্যাটেল নেন ৪ উইকেট। মোটের ওপর দেখা যায়, ব্যাট আর বল দুই জায়গাতেই ভারত সবসময় একটু এগিয়ে থেকেছে, যদিও রশিদ বা গুরবাজের মতো খেলোয়াড়রা মাঝেমধ্যে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন।
ভারত কেন এগিয়ে
এই আধিপত্যের পেছনে কারণ কিন্তু একটা না, বেশ কয়েকটা। প্রথমত, ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ অনেক লম্বা— ওপরের দিক থেকে নিচ পর্যন্ত রান করার মতো ব্যাটার আছে। দ্বিতীয়ত, বোলিংয়েও অনেক অপশন— পেস, সুইং, স্পিন সবকিছু মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা সহজ হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, বড় মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতের অনেক বেশি। বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপের মতো টুর্নামেন্টে বারবার খেলার কারণে চাপের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে ভারতীয় খেলোয়াড়রা। এর সঙ্গে ঘরের মাঠের সুবিধা আর আইপিএলে সারাবছর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার অভ্যাস তো আছেই। সব মিলিয়েই আফগানিস্তানের বিপক্ষে ভারত এখনো অপরাজিত থেকে গেছে।
আফগানিস্তান কতটা শক্তিশালী
তবে আফগানিস্তানকে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। তাদের স্পিন বিভাগ বিশ্বমানের— রশিদ খান, মোহাম্মদ নবী, নূর আহমাদরা যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপকে বেঁধে রাখতে পারেন। টি-টোয়েন্টিতে তো এই স্পিন-বৈচিত্র্য অনেক বড় দলকেই ভুগিয়েছে।
ব্যাটিংয়ে ওদের স্টাইলটাই আক্রমণাত্মক— গুরবাজ, ইব্রাহিম জাদরান বা হজরতউল্লাহ জাজাই শুরু থেকেই মারতে চান, যেকোনো সময় ম্যাচের রং বদলে দিতে পারেন। ফজলহক ফারুকি আর মুজিব উর রহমানও নতুন বলে উইকেট তোলায় দক্ষ। ২০২৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-পাকিস্তানের মতো দলকে হারানো, বা ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা— এসব দেখিয়ে দেয় আফগানিস্তান এখন আর সহজ প্রতিপক্ষ নয়। ভারতের বিপক্ষে জয় এখনো আসেনি ঠিকই, কিন্তু ২০২৪ সালের বেঙ্গালুরু টাই বা ২০১৮ সালের এশিয়া কাপ টাই বলে দেয়, সুযোগ পেলে তারা লড়াই জমাতে জানে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে লড়াইটা
২০১০ সালে প্রথম যখন দুই দল মুখোমুখি হয়, আফগানিস্তান তখন অনেকটাই আন্ডারডগ ছিল, ভারতের সামনে টিকে থাকাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ২০১৮ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক দল হিসেবে গড়ে তুলেছে তারা। সেই বছরের এশিয়া কাপে ভারতের সঙ্গে ওয়ানডে টাই করাটা ছিল তাদের জন্য একটা বড় মুহূর্ত।
২০২৪ সালের বেঙ্গালুরু সিরিজেও আফগানিস্তান দেখিয়ে দেয়, ভারতের মতো দলের বিপক্ষেও তারা শেষ পর্যন্ত লড়তে পারে। তবে ২০২৬ সালে ভারতের মাটিতে টেস্ট-ওয়ানডে সিরিজে তাদের যে বিবর্ণ পারফরম্যান্স দেখা গেল, তাতে বোঝা যায় লম্বা ফরম্যাটে এখনো ভারতের সঙ্গে ব্যবধান বেশ বড়। মানে টি-টোয়েন্টিতে ব্যবধান কমলেও, টেস্ট আর ওয়ানডেতে ভারতের আধিপত্য এখনো স্পষ্ট।
ভারত বনাম আফগানিস্তান: শেষ পর্যন্ত এগিয়ে কে?
শুধু জয়-হারের সংখ্যা দিয়ে দেখলে উত্তরটা সহজ— ভারত। কিন্তু পুরো ছবিটা বুঝতে আরও কিছু বিষয় দেখা দরকার।
সামগ্রিক রেকর্ডে ভারতের ১৬ জয়ের বিপরীতে আফগানিস্তানের কোনো জয় নেই, সঙ্গে আছে একটা টাই আর একটা ফলাফলহীন ম্যাচ। সাম্প্রতিক ফর্মও ভারতের পক্ষে কথা বলছে— শেষ পাঁচ ম্যাচের সবকটাতেই জিতেছে তারা। ব্যাটিং-বোলিং দুই জায়গাতেই ভারতের হাতে বেশি অপশন, আর বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাও তাদের বেশি।
তবে টি-টোয়েন্টিতে আফগানিস্তানকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। রশিদ খানদের স্পিন আর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং যেকোনো এক ম্যাচে চমক দেখিয়ে দিতে পারে, ঠিক যেমনটা বেঙ্গালুরুতে প্রায় দেখিয়েই দিয়েছিল তারা। তাই সামগ্রিকভাবে ভারত স্পষ্ট এগিয়ে থাকলেও, টি-টোয়েন্টিতে দুই দলের ব্যবধানটা তুলনামূলক কম— আর এখানেই লুকিয়ে আছে আফগানিস্তানের প্রথম জয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
ভারত বনাম আফগানিস্তান মুখোমুখি পরিসংখ্যান বলছে, তিন ফরম্যাট মিলিয়েই এখনো পর্যন্ত অপরাজিত ভারত। দলীয় শক্তি, অভিজ্ঞতা আর ধারাবাহিকতায় ভারত স্পষ্ট এগিয়ে, তবে আফগানিস্তান যেভাবে দিনদিন উন্নতি করছে, তাতে প্রতিটা ম্যাচেই একটু অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
মোটকথা, এখনকার হিসেবে ভারতই এগিয়ে আর তারাই ফেভারিট। কিন্তু আফগানিস্তান যেভাবে প্রতি সিরিজে নিজেদের ভালো করছে, তাতে ভবিষ্যতে এই লড়াই আরও জমে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি।
এশিয়া কাপের সেরা ১০ বোলার: সর্বকালের সেরা তালিকা
ভারত বনাম আফগানিস্তান প্রশ্নোত্তর
ভারত বনাম আফগানিস্তান কতটি ম্যাচ খেলেছে?
টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে দুই দল এখন পর্যন্ত মোট ১৮টি ম্যাচ খেলেছে— ২টি টেস্ট, ৭টি ওয়ানডে আর ৯টি টি-টোয়েন্টি।
ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে বেশি ম্যাচ কে জিতেছে?
ভারতই এগিয়ে, তারা ১৬টা ম্যাচ জিতেছে। আফগানিস্তান এখনো একটাও জেতেনি, তবে একটা ওয়ানডে আর একটা টি-টোয়েন্টি টাই হয়েছে।
ভারত বনাম আফগানিস্তানের সর্বশেষ সমাপ্ত ম্যাচ কে জিতেছে?
সর্বশেষ শেষ হওয়া ম্যাচটা ছিল ২০২৬ সালের জুনে চেন্নাইয়ে তৃতীয় ওয়ানডে, যেখানে ভারত ৯ উইকেটে জেতে। এর মধ্য দিয়ে ওয়ানডে সিরিজটাও ৩-০ ব্যবধানে জিতে নেয় তারা।
টি-টোয়েন্টিতে ভারত বনাম আফগানিস্তানের রেকর্ড কী?
টি-টোয়েন্টিতে এখন পর্যন্ত ৯ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, ভারত জিতেছে ৮টা, আর একটা ম্যাচের ফলাফল হয়নি। এই ফরম্যাটেও আফগানিস্তানের এখনো কোনো জয় নেই।
ভারত বনাম আফগানিস্তান ম্যাচে ভালো খেলোয়াড় কারা?
ভারতের হয়ে শুবমান গিল, শিবম দুবে, গুরনূর ব্রার আর প্রসিধ কৃষ্ণা নজর কেড়েছেন। আফগানিস্তানের হয়ে রহমানুল্লাহ গুরবাজ, রশিদ খান আর গুলবদিন নাইব ভালো খেলেছেন, যদিও দলকে জেতাতে পারেননি।